ঢাকা বুধবার, ১লা ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৮

ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের তুলনা, কড়া জবাব দিলেন আসিফ নজরুল


প্রকাশিত:
২৪ এপ্রিল ২০২০ ০৮:০৭

আপডেট:
২৫ এপ্রিল ২০২০ ১৮:২২

সংগৃহীত

করোনা মহামারির সময় বিজ্ঞান ও ধর্মের তুলনা হাস্যকর বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের এক স্ট্যাটাসে তিনি এ মন্তব্য করেন।

তিনি ফেসবুকে লেখেন, ‘ধর্ম ও বিজ্ঞান দুটোই প্রয়োজনীয়। ধর্ম বিশ্বাস করলে বিজ্ঞানকে অবজ্ঞা করতে হবে কেন? বিজ্ঞানমনস্ক হয়েছেন বলে ধর্মকে অবজ্ঞা করেন কেন?’

‘পৃথিবীতে বহু বড় বিজ্ঞানী ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন। অনেকে আবার ছিলেনও না। কিন্তু এ জন্য তারা ধর্মবিশ্বাস নিয়ে উপহাস করেছেন বলে শুনিনি।’

‘করোনা থেকে বেঁচে গেলে বিজ্ঞানের কারণে বাঁচব, মসজিদ-মন্দিরের কারণে না’–এমন একটি প্রচারণা চলছে ফেসবুকে। এ ধরনের অতিসরলীকৃত ও উসকানিমূলক বক্তব্যের জবাব দেয়ার প্রয়োজন ছিল না। তবে এমন কেউ কেউ এটি শেয়ার করছেন যে, মনে হয় কিছু বিষয় তুলে ধরা উচিত।

‘বিশ্বে এখনও করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ২৭ লাখের মতো। শেষ পর্যন্ত যদি এর দশগুণ (প্রায় ৩ কোটি) লোকেরও করোনা হয়, তার মানে হবে ৯৯.৫ শতাংশ ব্যক্তি আক্রান্ত হবে না। এই সাড়ে ৯৯ শতাংশ ব্যক্তির করোনা আক্রান্ত না হওয়া বিজ্ঞানের অবদান না।’

‘এটা হবে কিছুটা তাদের ভাগ্যগুণে (ধর্মপ্রাণ মানুষের মতে, আল্লাহ বা স্রষ্টার অনুগ্রহে) আর কিছুটা সতর্কতার কারণে। আক্রান্তদের মধ্যে আবার কমপক্ষে ৯০ শতাংশ সুস্থ হচ্ছে শরীরের এন্টিবডির জন্য। এন্টিবডি হিসেবে শরীরে যে টি সেল ও বি সেল নামে দুটো সেল কাজ করে তা বিজ্ঞানের সৃষ্টি নয়, এগুলো এমনিতে থাকে মানুষের শরীরে।’

‘করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হলে করোনায় মৃত্যুর হার অনেক কমে যাবে। এই প্রতিষেধকও একা কিছু করতে পারবে না, যদি আপনার ইম্যুনিটি সিস্টেম কাজ না করে, এই সিস্টেম বিজ্ঞানের তৈরি না। আর প্রতিষেধক হিসেবে যে এন্টিবডি বা জেনেটিক মেটেরিয়াল ব্যবহার করা হবে তাও বিজ্ঞানের সৃষ্টি না। বিজ্ঞান শুধু এটি প্রতিষেধকে রূপান্তরিত করবে। ধর্মপ্রাণ মানুষ বিশ্বাস করে এসব মেটেরিয়ালস ও বৈজ্ঞানিকের বুদ্ধি সবটাই আল্লাহ/স্রষ্টার দান।’

‘সত্য বা সমস্যাটা এখানে। এন্টিবডি বা ভাগ্যের কারণে যারা বাঁচবে, ধর্মপ্রাণ মানুষ বিশ্বাস করবে– এটি স্রষ্টার দান। বিজ্ঞান যাদের বাঁচাতে পারবে, ধর্মপ্রাণ মানুষ বিশ্বাস করবে– সেটিও স্রষ্টার দান। কাজেই করোনা বিষয়ে বিজ্ঞানের তুলনায় ধর্মকে হেয় করে ধর্মপ্রাণ মানুষকে হয়তো অপমান করা যাবে, কিন্তু তার ধর্মবিশ্বাসে চিড় ধরানো যাবে না। এই অপমান করার কোনো যুক্তি নেই। কারণ ধর্মের প্রকৃত বাণীর চেয়ে সুন্দর ও মঙ্গলকর কিছু নেই কোথাও।’

‘বিজ্ঞান মানুষের সৃষ্টি, ধর্মমতে এই মানুষ স্রষ্টার সৃষ্টি, স্রষ্টার অনন্ত ও অসীম সৃষ্টিজগতের একটি অতিক্ষুদ্র বালুকণায় (পৃথিবী) এর কিছু মানুষ বিজ্ঞানচর্চা করেন। এই চর্চা অতিপ্রয়োজনীয় ও মনোমুগ্ধকর কিছু আবিষ্কার করেছে। কিন্তু এটিও আবিষ্কার করেছে যে মহাবিশ্বের ৯৫ শতাংশ সম্পর্কে (ডার্ক এনার্জি) বিজ্ঞান কোনো দিন কিছু জানতে পারবে না; বাকি ৫ শতাংশ সম্পর্কেও তার জ্ঞান খুব কম ও নিয়ত পরিবর্তনশীল। অন্যদিকে ধর্ম এ ৯৫ শতাংশ ও বাকি ৫ শতাংশের সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী।’

‘ধর্মের কাজ মানুষের নৈতিকতা, আত্মিক পরিশুদ্ধি নিয়ে। এসব বিজ্ঞানের বিষয় নয়। বিজ্ঞান যুক্তি ও জ্ঞাননির্ভর, ধর্মবিশ্বাস ও উপলব্ধিনির্ভর। বিজ্ঞানের কাছে ইহজগত সব, ধর্মের কাছে ইহজগত তুচ্ছ, এটি বরং পরজগতের জন্য এক পলকের পরীক্ষা মাত্র।’

‘ধর্ম নিয়ে অপপ্রচারকারীদের উদ্দেশে ঢাবির এই অধ্যাপক বলেন, ধর্ম আর বিজ্ঞান এত ভিন্ন যে, করোনা নিয়ে এদের তুলনা হাস্যকর ও চরম অজ্ঞতাপ্রসূত। আমরা কি বলি করোনা থেকে যদি বেঁচে যাও, জেনো ডাক্তার বাঁচাবে, তোমার বাবা-মা না। এটা বলে কি আমরা আশা করি ডাক্তারকে শুধু ভালোবাসা উচিত আমার, পিতামাতা বা অন্য কাউকেও না। আমরা কি কখনও বলি– সাকিব কি সুন্দর ক্রিকেট খেলে, মেসি তো ক্রিকেট খেলতেই পারে না। ধর্ম ও বিজ্ঞানের তুলনা এসবের চেয়ে বহুগুণে হাস্যকর ও অবান্তর।’

‘ধর্মান্ধতা আর ধর্মবিদ্বেষ দুটোই পরিত্যাজ্য। ‘বেঁচে গেলে বিজ্ঞানের কারণে বাঁচব, মসজিদ-মন্দিরের কারণে নয়’- এমন অদ্ভুত কথা সম্ভবত ধর্মবিদ্বেষ থেকে প্রচারিত।’



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top